আপনার বাসার ওয়াইফাই সিকিউরিটির ছোট ভুলগুলো বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ওয়াইফাই সিকিউরিটি বাড়াতে অর্থাৎ সাইবার অপরাধীদের কাছ থেকে আপনার নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখতে এই ৭টি সহজ ধাপ অনুসরণ করুন এবং নিজের তথ্য ও ডিভাইসগুলোকে সুরক্ষিত রাখুন।
ওয়াইফাই সিকিউরিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের দিনে ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট ছাড়া জীবন প্রায় কল্পনাই করা যায় না। আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, কেবল অনলাইন ব্যাঙ্কিং বা ক্রেডিট কার্ড পেমেন্টই নয়, আপনার ঘরে থাকা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, স্মার্ট ডিভাইস, এমনকি আপনার নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং এয়ার কন্ডিশনারও আপনার ওয়াইফাই-এর সাথে সংযুক্ত থাকে।
এতে সুবিধা রয়েছে, কিন্তু যদি Wi-Fi নেটওয়ার্কে সামান্য নিরাপত্তা দুর্বলতাও থেকে যায়, তা হলে হ্যাকার ও সাইবার অপরাধীরা সেই নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করতে পারে। শুধু আপনার নেটওয়ার্ক নয়, নেটওয়ার্কে সংযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসও হুমকির মুখে পড়তে পারে। আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ইমেইল, এবং এমনকি ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে চিন্তার কিছু নেই, কারণ কয়েকটি সহজ ধাপ অনুসরণ করলেই আপনার ওয়াইফাই সিকিউর রাখা সম্ভব। চলুন দেখি, কীভাবে আপনি আপনার বাসার Wi-Fi-এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।
১. আপনার ওয়াইফাই-এর ডিফল্ট নাম পরিবর্তন করুন
প্রথমেই আপনার ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের নাম, অর্থাৎ SSID (Service Set Identifier), পরিবর্তন করুন। বেশিরভাগ রাউটারের ডিফল্ট নাম থাকে যা সাধারণত রাউটারের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম অনুযায়ী থাকে। এ ধরনের ডিফল্ট নাম ব্যবহার করা নিরাপদ নয়, কারণ এটি হ্যাকারদের জন্য একটি ইঙ্গিত হতে পারে যে, কোন ধরনের রাউটার ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কীভাবে সেটিতে প্রবেশ করা যেতে পারে।
আপনি একটি এমন নাম নির্বাচন করুন যা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে না, যেমন আপনার নাম বা ঠিকানা। উদাহরণস্বরূপ, “ShawonHomeWiFi” এর পরিবর্তে এমন একটি নাম দিন যা অনুমান করা কঠিন হবে।
২. শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড তৈরি করুন
ওয়াইফাই নেটওয়ার্কের জন্য একটি ইউনিক এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ রাউটার একটি ডিফল্ট পাসওয়ার্ড নিয়ে আসে, যা সাধারণত অনুমান করা সহজ হয়। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করার সময়, কমপক্ষে ২০টি অক্ষর, সংখ্যা, বড় ও ছোট হাতের অক্ষর এবং বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করুন।
যেমন একটি উদাহরণ হতে পারে: “Xy7&hQ8l!56@j9Wz2#p”. যত বেশি জটিল ও ইউনিক পাসওয়ার্ড হবে, ততই হ্যাকারদের জন্য তা ভাঙা কঠিন হবে।
৩. নেটওয়ার্ক এনক্রিপশন এক্টিভ করুন
ওয়াইফাই রাউটারে এনক্রিপশন ফিচার থাকে, যা অনেক সময় ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকে। আপনার নেটওয়ার্ককে এনক্রিপ্ট করে রাখা মানে এটি নিশ্চিত করা যে, শুধুমাত্র অনুমোদিত ডিভাইসগুলোই নেটওয়ার্কে অ্যাক্সেস করতে পারবে।
WPA2 এনক্রিপশন হল বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ এনক্রিপশন পদ্ধতি। আপনার রাউটারের সেটিংসে গিয়ে এনক্রিপশন অপশনটি চালু করুন। মনে রাখবেন, কিছু পুরনো রাউটারে WPA2 অপশনটি নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি আপডেটেড রাউটার কেনার কথা ভাবতে পারেন।
৪. নেটওয়ার্ক নাম (SSID) ব্রডকাস্ট বন্ধ রাখুন
আপনার নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা আরও বাড়াতে, SSID ব্রডকাস্ট বন্ধ রাখুন। যদি SSID ব্রডকাস্ট চালু থাকে, তাহলে আশেপাশের সবাই আপনার ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক দেখতে পাবে। এটি হ্যাকারদের জন্য একটি সুবিধা, কারণ তারা সহজেই আপনার নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে পারবে।
SSID ব্রডকাস্ট বন্ধ রাখলে আপনার নেটওয়ার্ক অদৃশ্য হয়ে যাবে, এবং শুধুমাত্র যারা নেটওয়ার্কের নাম জানবে তারাই তা খুঁজে পাবে।
৫. আপনার রাউটারের সফটওয়্যার আপডেট করুন
রাউটারের ফার্মওয়্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা সময়ে সময়ে আপডেট করা প্রয়োজন। রাউটারের নির্মাতারা প্রায়ই নিরাপত্তা হুমকির প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফার্মওয়্যার আপডেট প্রদান করে থাকে। আপনার রাউটার আপডেট না থাকলে, এটি হ্যাকারদের জন্য একটি দুর্বল পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আপনার রাউটারের ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিয়মিত ফার্মওয়্যার আপডেট চেক করুন এবং প্রয়োজনীয় আপডেট ইনস্টল করুন।
৬. রাউটারের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়াল চালু রাখুন
ফায়ারওয়াল হল প্রথম স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আপনার নেটওয়ার্ককে বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বেশিরভাগ রাউটারে বিল্ট-ইন ফায়ারওয়াল থাকে, কিন্তু অনেক সময় এটি ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকে।
আপনার রাউটারের সেটিংসে গিয়ে ফায়ারওয়াল অপশনটি চালু করুন। যদি আপনার রাউটারে বিল্ট-ইন ফায়ারওয়াল না থাকে, তাহলে ভাল মানের ফায়ারওয়াল সফটওয়্যার ইনস্টল করার কথা ভাবতে পারেন।
৭. VPN ব্যবহার করে নিরাপদ থাকুন
VPN (Virtual Private Network) ব্যবহার করে আপনি আপনার ইন্টারনেট সংযোগকে আরও সুরক্ষিত রাখতে পারেন। VPN আপনার ইন্টারনেট ট্রাফিক এনক্রিপ্ট করে এবং হ্যাকারদের প্রবেশ করা কঠিন করে তোলে।
যখন আপনি VPN ব্যবহার করবেন, তখন আপনার ডেটা এনক্রিপ্ট করা হবে এবং হ্যাকারদের জন্য আপনার কার্যকলাপ নজরদারি করা প্রায় অসম্ভব হবে। ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তার জন্য VPN একটি কার্যকর সমাধান।
অতিরিক্ত কিছু টিপস
আপনার Wi-Fi-তে সংযুক্ত প্রতিটি ডিভাইসের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। প্রতিটি ডিভাইসে সর্বশেষ নিরাপত্তা সফটওয়্যার এবং অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করা থাকলে তা সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।
Wi-Fi ব্যবহার না করলে আপনার রাউটার বন্ধ রাখুন। এটি হ্যাকারদের জন্য একটি অতিরিক্ত বাধা তৈরি করবে।
যাইহোক আপনার বাসার Wi-Fi নিরাপদ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধুমাত্র আপনার ইন্টারনেট ব্যবহার নয়, বরং আপনার সমস্ত সংযুক্ত ডিভাইস এবং তথ্যকেও রক্ষা করে। উপরের ৭টি ধাপ অনুসরণ করে আপনি সহজেই আপনার নেটওয়ার্ককে সুরক্ষিত রাখতে পারেন এবং সাইবার অপরাধীদের হাত থেকে নিরাপদে থাকতে পারবেন।
আপনার ওয়াইফাই সিকিউরিটি বাড়াতে কিছু সময় ব্যয় করুন, এতে ভবিষ্যতে আপনার অনেক বড় সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ঘুরে দেখতে পারেন আমাদের সাইবার সিকিউরিটি ক্যাটেগরি।
কমেন্ট
কাওসার মাতুব্বর
sundar hoiche
কমেন্ট করুন