কিভাবে হারিয়ে গেলো ইয়াহু

কিভাবে হারিয়ে গেলো ইয়াহু

ইয়াহু! (Yahoo!) প্রযুক্তি জগতের একটি অবিস্মরণীয় নাম। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এটি বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত একটি নামে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং ধীরে ধীরে প্রযুক্তি জগত থেকে হারিয়ে যায় জনপ্রিয় এই নামটি। ইয়াহুর উত্থান ও পতনের এই গল্পটি শুধু একটি কোম্পানির ইতিহাসই নয়। এটি প্রযুক্তি জগতের পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার এক জীবন্ত উদাহরণ।

ইয়াহুর উত্থান

ইয়াহুর জন্ম হয় ১৯৯৪ সালে, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির দুই ছাত্র জেরি ইয়াং (Jerry Yang) এবং ডেভিড ফিলো (David Filo) এর হাত ধরে। শুরুতে এটি “জেরি অ্যান্ড ডেভিড’স গাইড টু দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব” নামে একটি ডিরেক্টরি হিসেবে কাজ করত। ব্যবহারকারীরা এই ডিরেক্টরির মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়েবসাইট খুঁজে পেতেন, যা তখনকার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক ছিল।

ইয়াহু দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ১৯৯৬ সালে এটি একটি পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হয়। এর IPO (Initial Public Offering) ছিল সে সময়ের সবচেয়ে সফল IPO গুলোর মধ্যে একটি। ইয়াহু শুধু একটি সার্চ ইঞ্জিনই ছিল না, বরং এটি ইমেল, নিউজ, স্পোর্টস, ফাইন্যান্স, এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করত, যা ব্যবহারকারীদের জন্য অন-স্টপ ডেস্টিনেশন হিসেবে কাজ করত।

সাফল্যের শিখরে

২০০০-এর দশকের শুরুতে ইয়াহু ছিল ইন্টারনেট জগতের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়। এর ইমেল সেবা (Yahoo! Mail) এবং মেসেঞ্জার সেবা (Yahoo! Messenger) বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এছাড়াও, ইয়াহু ফাইন্যান্স, ইয়াহু নিউজ, এবং ইয়াহু স্পোর্টস এর মতো সেবাগুলো ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।

ইয়াহুর বিজ্ঞাপন-ভিত্তিক ব্যবসায় মডেলও ছিল অত্যন্ত সফল। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইয়াহুর রাজস্ব ছিল বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, এবং এটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি।

আরো পড়ুনঃ

প্রতিযোগিতার মুখোমুখি

ইয়াহুর পতনের শুরু হয় ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যখন গুগল (Google) এবং পরে ফেসবুক (Facebook) এর মতো নতুন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো আবির্ভূত হয়। গুগল এর উন্নত সার্চ অ্যালগরিদম এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব ইন্টারফেসের মাধ্যমে দ্রুতই সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটে আধিপত্য বিস্তার করে। অন্যদিকে, ফেসবুক সোশ্যাল মিডিয়া জগতে বিপ্লব ঘটায়।

ইয়াহু এই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়। কোম্পানিটি নতুন প্রযুক্তি এবং ব্যবহারকারীর চাহিদার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। এর সার্চ ইঞ্জিন গুগলের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে, এবং এর ইমেল ও মেসেঞ্জার সেবাগুলোও নতুন প্রজন্মের ব্যবহারকারীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।

ব্যবস্থাপনাগত ভুল ও কৌশলগত ত্রুটি

ইয়াহুর পতনের পেছনে ব্যবস্থাপনাগত ভুল এবং কৌশলগত ত্রুটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোম্পানিটি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গুগল এবং ফেসবুক কিনে ফেলার সুযোগ। ২০০২ সালে ইয়াহু গুগল কিনে ফেলার সুযোগ পেয়েছিল মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারে, কিন্তু তা করতে ব্যর্থ হয়। একইভাবে, ২০০৬ সালে ফেসবুক কিনে ফেলারও সুযোগ পেয়েছিল ইয়াহু, কিন্তু তা করতেও ব্যর্থ হয়।

এছাড়াও, ইয়াহুর ব্যবস্থাপনা দল নতুন প্রযুক্তি এবং ব্যবসায়িক মডেলের দিকে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়। কোম্পানিটি বেশ কয়েকবার তার CEO পরিবর্তন করে, কিন্তু কেউই ইয়াহুকে তার পূর্বের গৌরব ফিরিয়ে দিতে পারেনি।

পতন ও ভারিজনের অধিগ্রহণ

২০১০ সালের দিকে ইয়াহুর পতন ত্বরান্বিত হয়। কোম্পানিটি তার মূল ব্যবসা থেকে দূরে সরে যায় এবং বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালে ইয়াহু ঘোষণা করে যে তারা দুটি আলাদা কোম্পানিতে বিভক্ত হবে। একটি তার কোর ইন্টারনেট বিজনেস নিয়ে, এবং অন্যটি তার Alibaba এবং Yahoo Japan স্টেক নিয়ে।

২০১৭ সালে ভারিজন কমিউনিকেশনস (Verizon Communications) ইয়াহুর core internet business কিনে নেয় মাত্র ৪.৮৩ বিলিয়ন ডলারে। ভারিজনের অধীনে ইয়াহুর ব্রান্ড ভ্যালু আরও হ্রাস পায়, এবং ২০২১ সালে ভারিজন ইয়াহুকে Apollo Global Management এর কাছে বিক্রি করে দেয়।

ইয়াহুর উত্তরাধিকার

ইয়াহুর পতন সত্ত্বেও, এটি ইন্টারনেট জগতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইয়াহু ইন্টারনেটকে জনপ্রিয় করতে এবং ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর উত্থান ও পতনের গল্পটি প্রযুক্তি জগতের দ্রুত পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

ইয়াহুর গল্প আমাদের শেখায় যে, প্রযুক্তি জগতে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে অবশ্যই নতুন প্রযুক্তি এবং ব্যবহারকারীর চাহিদার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। অন্যথায়, ইয়াহুর মতো এক সময়ের জায়ান্টরাও ইতিহাসের পাতায় পরিণত হতে পারে।

ইয়াহুর উত্থান ও পতন শুধু একটি কোম্পানির গল্পই নয়, বরং এটি একটি ডিজিটাল যুগের প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তি জগতে সাফল্য অর্জন করতে হলে কোম্পানিগুলোকে সবসময় উদ্ভাবনী এবং ব্যবহারকারী কেন্দ্রিক হতে হবে। ইয়াহুর গল্পটি তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায়ই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতক্ষন সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ। ব্যবসা বিষয়ক আরো আর্টিকেল পড়তে আমাদের বিজনেস ক্যাটেগোরি ভিজিট করার অনুরোধ রইল। ইয়াহু নিয়ে আরো বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন ইউকিপিডিয়া

কমেন্ট

Anika Akter

Anika Akter

সময়ের সাথে তাল না মিলাতে পারলে অনেক বড় কোম্পানিও একদিন হারিয়ে যেতে বাধ্য

কমেন্ট করুন