ডিজিটাল ক্যামেরা আবিষ্কার করেও কেন হারিয়ে গেল কোডাক?

ডিজিটাল ক্যামেরা আবিষ্কার করেও কেন হারিয়ে গেল কোডাক?

একসময় ছবি তোলা মানেই ছিল কোডাক। পারিবারিক অনুষ্ঠান, জন্মদিন, ভ্রমণ কিংবা জীবনের বিশেষ কোনো মুহূর্ত ধরে রাখতে মানুষের প্রথম পছন্দ ছিল কোডাকের ক্যামেরা ও ফিল্ম। প্রতিষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে ইংরেজিতে স্মরণীয় কোনো মুহূর্তকে “Kodak Moment” বলা হতো।

তবে অবাক করার বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল ক্যামেরা উদ্ভাবনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে বাজারে তার নেতৃত্ব হারায়। কোডাকের এই উত্থান ও পতনের গল্প ব্যবসায়িক জগতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

কোডাকের যাত্রা শুরু

কোডাকের ইতিহাস শুরু হয় মার্কিন উদ্যোক্তা জর্জ ইস্টম্যানের হাত ধরে। তিনি এমন একটি ক্যামেরা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা ব্যবহার করার জন্য পেশাদার ফটোগ্রাফার হওয়ার প্রয়োজন হবে না। ১৮৮৮ সালে বাজারে আসা কোডাক ক্যামেরা সাধারণ মানুষের কাছে ছবি তোলাকে অনেক সহজ করে দেয়।

কোম্পানিটির বিখ্যাত বিজ্ঞাপনী স্লোগান ছিল—“You press the button, we do the rest।” অর্থাৎ, গ্রাহক শুধু ক্যামেরার বোতাম চাপবেন এবং ছবি তৈরি করার বাকি কাজ করবে কোডাক। সহজ ব্যবহার, উন্নত ফিল্ম এবং কার্যকর বিপণন কৌশলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করে।

কোডাকের সফল ব্যবসায়িক মডেল

কোডাক শুধু ক্যামেরা বিক্রি করে আয় করত না। এর প্রধান মুনাফা আসত ক্যামেরার ফিল্ম, ছবি প্রসেসিং, কাগজ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপকরণ বিক্রি থেকে।

ক্যামেরা একবার কেনা হলেও গ্রাহককে নিয়মিত ফিল্ম কিনতে হতো এবং ছবি তোলার পর সেগুলো প্রিন্ট করতে হতো। ফলে একজন গ্রাহক দীর্ঘ সময় ধরে কোডাকের বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ব্যবহার করতেন। এই ব্যবসায়িক মডেল কোডাককে বহু বছর ধরে ফটোগ্রাফির বাজারে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সাহায্য করে।

সমস্যা হলো, প্রতিষ্ঠানটি এই লাভজনক মডেলের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে নতুন প্রযুক্তিকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সাহস দেখাতে পারেনি।

কোডাকের হাতেই তৈরি হয়েছিল ডিজিটাল ক্যামেরা

১৯৭৫ সালে কোডাকের প্রকৌশলী স্টিভ স্যাসন প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজিটাল ক্যামেরার একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। ক্যামেরাটির ওজন ছিল প্রায় আট পাউন্ড এবং এটি ০.০১ মেগাপিক্সেলের সাদা-কালো ছবি ধারণ করতে পারত। একটি ছবি ক্যাসেট টেপে সংরক্ষণ করতে প্রায় ২৩ সেকেন্ড সময় লাগত।

বর্তমান স্মার্টফোন ক্যামেরার তুলনায় এটি খুবই সাধারণ মনে হলেও সে সময় এটি ছিল যুগান্তকারী উদ্ভাবন। কোডাকের একজন প্রকৌশলী ভবিষ্যতের ফটোগ্রাফি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির সামনে এনে দিয়েছিলেন।

কিন্তু কোডাকের ব্যবস্থাপনা বুঝতে পেরেছিল, ডিজিটাল ক্যামেরা জনপ্রিয় হলে মানুষ আর আগের মতো ফিল্ম কিনবে না বা ছবি প্রিন্ট করবে না। এতে কোম্পানির সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানটি ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর গবেষণা চালালেও নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরিতে যথেষ্ট দ্রুততা দেখায়নি।

নিজের ব্যবসা রক্ষার ভয়

কোডাকের বড় ভুল ছিল নতুন প্রযুক্তিকে শুধু পুরোনো ব্যবসার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা। প্রতিষ্ঠানটি ভাবছিল, ডিজিটাল ক্যামেরাকে দ্রুত বাজারে আনলে ফিল্মের বিক্রি কমে যাবে।

এই ধরনের পরিস্থিতিকে ব্যবসায়িক ভাষায় “ক্যানিবালাইজেশন” বলা হয়। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানের নতুন পণ্য তার পুরোনো পণ্যের বিক্রি কমিয়ে দেয়। কোডাক নিজের লাভজনক ফিল্ম ব্যবসাকে রক্ষা করতে গিয়ে ভবিষ্যতের বড় বাজারে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হারায়।

অথচ বাজারের পরিবর্তন কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে না। কোডাক ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ধীরে গ্রহণ করলেও সনি, ক্যানন, নিকন এবং অন্যান্য কোম্পানি দ্রুত ডিজিটাল ক্যামেরার বাজারে প্রবেশ করে।

ছবি তোলার ধারণাই বদলে যায়

ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলার পর সেটি ভালো হয়েছে কি না, তা সঙ্গে সঙ্গে দেখা যেত না। ছবি দেখতে হলে ফিল্ম প্রসেস করতে হতো। অন্যদিকে, ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গে তা দেখা, মুছে ফেলা, সংরক্ষণ করা এবং কম্পিউটারে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।

ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পরবর্তী সময়ে স্মার্টফোনের প্রসারের কারণে মানুষের ছবি তোলার অভ্যাস সম্পূর্ণ বদলে যায়। মানুষ আর শুধু ছবি প্রিন্ট করতে চাইত না; তারা ছবি সংরক্ষণ, সম্পাদনা এবং অনলাইনে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাইত।

কোডাক ডিজিটাল ক্যামেরা তৈরি করেছিল, কিন্তু ডিজিটাল ছবি ব্যবহার ও শেয়ার করার পুরো অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী ব্যবসায়িক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। ব্যবসা বিশ্লেষকদের মতে, কোডাকের পতন শুধু প্রযুক্তি না বোঝার কারণে হয়নি; পরিবর্তিত বাজারের জন্য উপযুক্ত ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে না পারাও ছিল বড় কারণ।

প্রতিযোগীরা যেভাবে এগিয়ে যায়

কোডাক যখন পুরোনো ও নতুন ব্যবসার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছিল, তখন প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো ডিজিটাল ক্যামেরার মান উন্নয়ন, দাম কমানো এবং ব্যবহার সহজ করার দিকে মনোযোগ দেয়।

বিশেষ করে জাপানি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত নতুন মডেলের ক্যামেরা বাজারে আনতে থাকে। পরে ক্যামেরাসহ মোবাইল ফোন জনপ্রিয় হওয়ায় আলাদা ক্যামেরার প্রয়োজনও কমে যায়। এই পরিবর্তনের ফলে কোডাকের ফিল্ম, প্রসেসিং এবং সাধারণ ক্যামেরার বাজার দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে।

কোডাকও ডিজিটাল ক্যামেরা ও প্রিন্টার বাজারে আনার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখন বাজারে শক্তিশালী প্রতিযোগী তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং ডিজিটাল ক্যামেরা বিক্রি থেকে ফিল্ম ব্যবসার মতো নিয়মিত ও উচ্চ মুনাফা পাওয়া সম্ভব ছিল না।

দেউলিয়া হতে আবেদন

দীর্ঘদিনের আর্থিক সমস্যা, বাজার হারানো এবং ব্যবসায়িক কাঠামো পরিবর্তনে বিলম্বের পর ২০১২ সালের জানুয়ারিতে কোডাক যুক্তরাষ্ট্রে Chapter 11 bankruptcy protection-এর আবেদন করে।

এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বরং ঋণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনর্গঠনের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল। ২০১৩ সালে কোডাক দেউলিয়াত্বের প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে আসে এবং ভোক্তাদের সাধারণ ক্যামেরার পরিবর্তে বাণিজ্যিক প্রিন্টিং ও অন্যান্য প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করে।

কোডাক কি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে?

কোডাক নামটি এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বাণিজ্যিক প্রিন্টিং, প্যাকেজিং, প্রকাশনা, উন্নত উপকরণ, রাসায়নিক পণ্য এবং চলচ্চিত্রের ফিল্মসহ বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সাধারণ মানুষের ক্যামেরা ও ফটোগ্রাফির বাজারে কোডাকের আগের আধিপত্য আর নেই।

অর্থাৎ, কোডাক এখনো বেঁচে আছে, কিন্তু এটি আগের কোডাক নয়। একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের ছবি তোলার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করত, বর্তমানে সেটি তুলনামূলকভাবে ছোট ও বিশেষায়িত বাজারে কাজ করছে।

কোডাকের পতন থেকে

কোডাকের গল্প থেকে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারেন।

প্রথমত, বর্তমান ব্যবসা লাভজনক হলেও বাজারের পরিবর্তনকে অবহেলা করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই সফল হবে না; সেই প্রযুক্তির উপযোগী ব্যবসায়িক মডেলও তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, নিজের পুরোনো পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ার ভয় থাকলেও প্রয়োজনের সময় নতুন পণ্য বাজারে আনতে হবে। অন্যথায় প্রতিযোগীরা সেই সুযোগ গ্রহণ করবে।

সবশেষে, গ্রাহক আসলে কোন পণ্য কিনছেন, তার চেয়ে তারা কোন সুবিধা চাইছেন—এটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোডাক মনে করেছিল তার ব্যবসা ফিল্ম ও ছবি প্রিন্ট করা। বাস্তবে গ্রাহক চাইতেন নিজের স্মরণীয় মুহূর্ত সহজে ধারণ, সংরক্ষণ এবং অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে।

কোডাকের পতন তাই শুধু একটি বিখ্যাত কোম্পানির ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ব্যবসার জগতে অতীতের সাফল্য ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না। সময়ের সঙ্গে গ্রাহকের চাহিদা, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন করতে না পারলে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানও একদিন তার নেতৃত্ব হারাতে পারে।

কমেন্ট করুন